রবীন মুখোপাধ্যায় এর একগুচ্ছ কবিতা

0
446
শয়তানের ইশারা
রবীন মুখোপাধ্যায়
তোমায় আমায় লাগিয়ে দিয়ে
লাভ তুলে নে কারা
চোখ বুঝে ভাই একটু ভাব
হোস নে দিশেহারা।
ধর্ম নিয়ে সব খানেতে
আবেগে আঘাত হানে
আমার তোমার খুনাখুনি
ওরা সবই জানে।
দিন শেষে আমি মরি
তুমিও রক্ত ঝরাও
এসব কিছু বাদ দিয়ে
বন্ধুর হাতটা বাড়াও।
অল্পতেই জলিল ক্ষ্যাপে
সখানাথও যায় চটে
লাভের ফসল চলে যায় রে ভাই
ক্ষমতালোভীর ঘটে।
দু এক জনে সুড়সুড়ি দেয়
আমরা মরি ফাও
আর কত দিন মূর্খ থেকে
বাইবো ভাঙা নাও।
তোমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম
আমার ধর্মও শ্রেষ্ঠ
ধর্ম দিয়ে কখনো যেন
হয়ে নাকো ভ্রষ্ট।
উল্টো সেবক
রবীন মুখোপাধ্যায়
মুখে মুখে সেবক সবাই
আসলে তারা সামন্ত
জনগন সদাই থাকে
তাদের কাছে তটস্ত।
কথা বলতে গেলে তাদের সাথে
হয় ঘণ্টা পার
কারো কারো সাথে আবার
দেখা পাওয়াই ভার
আমার টাকায় বেতন পেয়ে
আমাকেই ধমকায়
চোখের দিকে তাকালে তাদের
পিলে শুধু চমকায়।
হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা
ভাবটা এমন ধরে
সব কিছু করছে যেন
নিজে খরচ করে।
আমাদের দেশে কবে হবে
সত্যিকারের সেবক
ভয় ভীত দেখাবে না আর
দিবে না কেবল ছবক।
ভোটের আগে ছুডু মেম্বর
বলছে কাছে পাবেন সবাই
তিন দিন ঘুরছি আমি
তাহার দেখা নাই।
বড় সাহেবদের স্যার না ডাকলে
বিপদ আছে ভারি
প্রয়োজনে কটু কথা গলাধাক্কা
মাথায় লাঠির বারি।
আমি জনতা জনার্দন
আমিও দেশের মালিক
কথায় আছে আমার কথা
আসলে ঢাল ছাড়া মানিক।
স্বপ্ন –২
রবীন মুখোপাধ্যায়
বেশ উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে বর্ষণ স্নাত আষাঢ়ের স্বল্প রজনী টা
কেটে গলে গত কাল।
জীবনের সহস্র পাপকর্ম আর অন্যেের গীবতে গীবতে
সুর্যাস্তের প্রায়োন্ধকারে আজ হাজির আমি।
যমও এসে দাড়াল দুয়ারে
যেতে হবে পরিচিত সবুজ শ্যামলিমা ছায়াসুনিবিড়
সাধের পৃথিবী ছেড়ে।
এতকরে বললাম যম মহোদয়কে,দেখুন ব্যাংকে আমার লোন আছে,
ছেলে পেলের গুলোর লেখাপড়া এখনও হয়নি শেষ
পাশের প্রতিবেশীর ধার শোধ করতে পারি নি এখনও
সাত বছর আগেরর ঘোষিত সরকারি নিয়োগ এখনও পায় নি,
দয়া করে একটু সময় দিন।
কথা দিলাম কাজ সেরে আপনার সাথে চলে যাবই।
যম মহেদয় অনড়,পাষাণের মত দাড়িয়ে রইলেন।
আমাকে বলনেন,কোথায় যাবেন স্বর্গে না নরকে?
হেসে বললাম,চিত্রগুপ্তের খাতায় কী লেখা আছে?
নির্ঘাত নরকের কথা।
চলুন তা হলে।
ভাবলাম ভালই হল,কত বিজ্ঞানী, কত সাহিত্যিক কত দার্শনিকদের সান্নিধ্য পাব সেখানে।
সক্রেটিস, আইনস্টাইন, টমাস, নিউটন, বেগম রোকেয়া আরো কত পৃথিবীর ঘোষিত মহাজ্ঞানী মুর্তাদদের দেখতে পাব।
আহমদ শরীফ স্যার আরজ আলী মাতুব্বরকে দেখলে বেশ ভালই লাগবে।
তাঁরা যে নরকে আছে তার প্রমান?
পৃথিবীতে বসে শুনেছি তারা নরকেই গেছেন।
কত রোমাঞ্চকর মন নিয়ে যমের সাথে উড়ে চলছি।
ভাবছি নরকে পৌঁছে,
প্রথমে উনাদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম ঠুকবো ষষ্টাঙ্গে
তারপর পায়ের ধুলা মাথায় মেখে বলব আমার নরক জীবন সার্থক হল।
শুনেছি ওখানে তেলে ভাজে,করাত দিয়ে কাটে,সাপ আর হিংস্র পশুরা গুবলে গুবলে খায় সারা শরীর আরো কত কী
ভাবলাম নিশ্চয়ই বিজ্ঞানীরা বাঁচার একটা ব্যবস্থা করেছেন
মার্কস এঙ্গেলস চে লেলিন ওরা এ ধরনের অমানবিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক বিপ্লব করেছেন নিশ্চয়ই।
যাই না, পরে দেখা যাবে কী হবে ওখানে।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ লোড শেডিং
ঘুম ভাঙল তখন সকাল।
খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে দেখলাম,ফ্যাকটরিতে আগুন লেগে শত শত মানুষ পুড়েে কয়লা হয়ে গেছে
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় দেড়শ লোকের মুণ্ডহীন বিভৎস লাশ
ধর্ষণের পর উলঙ্গ দেহে ফেলে রেখে গেছে কয়েকজন মেয়েকে পাট খেতে
পরকিয়ার লোভে শিশুপুত্রকে বালিশচাপা দিয়েছে মা
ভাই ভাইকে খুন করেছে সম্পত্তির লোভে
বিকাশে টাকা তুলে রাজনীতির নামে নেতা বনে গেছে ভণ্ড নেতা
ছেলে পুলে রেখে স্বামীকে ছেড়ে পালিয়ে গেছে জলিলের বউ
ধর্মের নামে রামরহিমসিং এর মত এখনও ধর্ষণ করে চলেছে অনেক সাধু বাবারা
এরশাদউল্লাহ্ আর সিরাজের মত মাদ্রাসার অনেক বড় হুজুরদের রোষানলে পর্দনশীল ছাত্রীরা
পরিমল স্যারেরাও পিছনে নেই ধর্ষণে
মন্দির মসজিদ ভাঙ্গাচুরার খবর, আর ধর্মের নামে উন্মাদনার ফসল হাজার লাশ
বলুন নরক এর চেয়েও কি বেশী খারাপ হবে?
শালা, লোডশেডিং এ ঘুম না ভাঙলে
স্বপ্নে হয়তো দেখে নিতুম একবার নরকটাকে।
অবসর চাই–সখানাথ
রবীন মুখোপাধ্যায়
জীবন থেকে অবসর চাই
অবসর চাই সৃষ্টিবিমুখ অলস কাজ থেকে।
স্বার্থ নিমগ্ন মানুষের শক্ত অয়োময় থেকে অবসর চাই।
নিত্য দিনের মায়া মমতার মিথ্যা মরীচিকা,
হিংসুটে লোভী জানোয়ার সদৃশ্য মানুষের সঙ্গ আর
পিছনে বসে দুর্নামের পদাবলি গাওয়া নিঁখুত শিল্পী থেকে,আমি অবসর চাই।
অবসর চাই এ নশ্বর দেহের কাঠামো থেকে
কীর্তিহীন জীবনের দীর্ঘ আয়ূ থেকে
অভাবে ধুকে মরা চিন্তার জীবন থেকে
রোগব্যাধির করাল গ্রাসে আক্রান্ত মাটির শরীর থেকে
অবসর চাই।
বৈষম্যে জর্জরীত সমাজ ব্যবস্থা,মামলা মোকদ্দমার যন্ত্রনা,অবিচারের আর্তনাদ আর প্রহসনের নাটক থেকে
অবসর চাই।
মিথ্যা অভিভাষণের ভণ্ডামি
,অযোগ্য মানুষের দৌরাত্ম আর মুখোশে আটকানো ভদ্রলোকদের রাজকীয় লাম্পট্য থেকে
অবসর চাই।
ক্লান্তপ্রাণ আর চারিদিকে সমুদ্রের সফেন দেখে
কার্তিকের নবান্ন উৎসবে
জীবনান্দের মত প্রকৃতির কাছে যাবার ক্ষমতাহীন সখানাথ অবসর চায়।
মহামিলনের মহানন্দে চিত্তবিভোরে থাকা সখানাথ
পৃথিবী থেকে অবসর চায়।
তোমরা আমাকে অবসর দাও
বল, দেবে কি আমায়?
আমি..
রবীন মুখোপাধ্যায়
আমি শতরূপার গর্ভসম্ভূত
মনুর ঔরশে আমার জন্ম।
আমি প্রকৃতির রুদ্ররোষে বেড়ে ওঠা
পৃথিবীর গর্বিত মালিক।
ঈশ্বরের আশীর্বাদে পরীক্ষার পর পরীক্ষায়
অবতীর্ণ হয়েছি আমি।
আমি প্রস্তর তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের ক্লান্তিহীন শ্রমিক,
হরোপ্পা বঙ্গ রাঢ় সমতটের এক কালের অধিবাসী।
আমি ইউরোপের সভ্যতা গড়ার কারিগর,
ইরাক থেকে আসা আমার পূর্বপুরুষ
মিশরীয় সভ্যতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী
বিভক্ত সপ্তমহাদেশের আমিনের আমি একজন।
আমি চারযুগ পেরিয়ে আসা পরিশ্রান্ত পথিক,
গুহাচারী হয়ে করেছি ভক্ষণ কাচা মাংস
আমি বন্যায় খরায় মহামারি আর মন্বন্তরে
শক্ত করে ধরে রেখেছি আমার অস্তিত্ব।
আমার গোত্রের লক্ষ কোটি মানুষের
অসহায় মৃত্যু দেখা আমি একজন নিরব সাক্ষী
আগুন জ্বালিয়ে সভ্যতার গৃহপ্রবেশ করে
মানবতার প্রেমে রচনা করেছি সোনার সংসার
তারপর স্নেহ আর মায়ার বেড়াজালে আটকে গিয়ে
অহেতুক দুঃখকে করেছি আমন্ত্রণ
নির্বান হয়নি কখনো আমার।
আমি পৃথিবীর মোহে স্বজনের টানে দুর্নিবার অনন্ততৃষা
নিয়ে বার বার জন্মেছি ধরার ধুলোতে
আমি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখেছি
রামরাবনের যুদ্ধ দেখে দেখে অজস্র মহামানবের খন্ডিত
যুদ্ধের মধ্যদিয়ে আমি বেড়ে উঠেছি
নানান মঙ্গল কাব্য আর সপ্তখণ্ড রামায়ণ পড়েছি
পড়েছি অপৌরুষেয় গ্রন্থ বেদ আর উপনিষদ।
আমি বহুধর্মের আবির্ভাবের মধ্যদিয়ে পেরিয়ে এলেও
ভগবানকে চিনতে পারি নি আজও
ইতিহাসের বহু নৃশংসতা দেখেছি,পাল গুপ্ত মৌর্য,সেন আমলের শাসন দেখেছি,
বহু আমলের পতন দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি
পতনের পদধ্বনিতে।
কেউ টিকে থাকতে পারে নি অনন্ত কাল ধরে।
মহাকালের ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে যাবে
দাপটের জ্বলন্ত শিখা।
তাই তো ভগবান আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে রুষ্ট হয়েছেন
নবযুগের প্রসব বেদনায় সতী প্রকৃতিকে নতুন ভূষণে
সাজিয়ে জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে দেবে।
তিনি নিরন্তর পর্যবেক্ষণে ছিলেন
আমাদের মত্রাতিরিক্ত আস্ফলন আর বিজ্ঞানের ঘন ঘন
উল্লম্ফনে তিনি বিরক্ত,
পশ্বাধম ক্রিয়া কর্মে আর আমাদের ক্ষমতার বাড়ববহ্নিশিখায় তিনি অসুন্তুষ্ট
তাই তো প্রলয় সাধনে সংহারী মূর্তি নিয়ে পৃথিবীর আগাছা নিড়াতে তিনি বদ্ধ পরিকর
আমাদের কামনা বাসনার লোল জিহ্বার মাত্রাতিরিক্ত
লোভে তিনি বিমুখ।
তিনি অংহকারের পতন ঘটিয়ে বিশ্ব বিবেক জাগিয়ে
একক পৃথিবীতে আবার এনে দেবেন সত্যযুগ।
আমি সেই যুগসন্ধিক্ষণের সাক্ষী হয়ে,
তোমাদের জন্য লিখে যাব নতুন কবিতা।
যে কবিতায় রাজাবাদশার কীর্তিগাথা থাকবে না,
থাকবেনা কোন মিথ্যা অভিভাষণের বাগাড়ম্বর,
ধর্মে ধর্মে গড়ে উঠবে না হিংসার প্রাচীর
সম্প্রসারন আর সাম্রাজ্যবাদীদের
একটাও শব্দ থাকবে না কবিতার চরণে
পৃথিবীতে কোন ভাগাভাগি নেই কারণ
এ পৃথিবীর সন্তান আমি।
চন্দ্র সূর্য পাহাড় পর্বত আর সসাগড়া পৃথিবীর মালিক
যদি ভগবান হন
আমি তার সন্তান হিসাবে পৃথিবীর প্রতিটি খতিয়ানে
চাই সমান অধিকার।
আদিম মানুষের মনবতা
রবীন মুখোপাধ্যায়
আদিম কালে উলঙ্গ ছিলাম
রেশমী শাড়ি কাতান সিল্ক
শেরওয়ানী কিংবা পাঞ্জাবি
কোনটাই ছিল না ভাই।
শরীরের লজ্জ্যা ঢাকতে পারিনি
কিন্তু চোখের লজ্জ্য ছিল তাই
আতর, গোলাপ জল, বালা বাউটি
স্নো পাউডার লিপিস্টিক
কিংবা হরেক রকম সাজন ছিল তাই
মনের মত সাজতে না পারলেও
প্রকৃতির সাজে সাজনের অভাব নাই।
মেম্বর চেয়ারম্যার মন্ত্রী নেতা কোর্ট কাচারি
চোখে দেখি নি ভাই
মামলা মোকদ্দমা তালাক খুনাখুনির মামলা
ঠুকি নাই।
সন্ধ্যা কালে ঘুমিয়ে পড়তাম মাটির গুহায়
সকাল বেলায় শিকাড়
পেট পুরে খেতাম মোরা যার যা ছিল আহার।
জমিদার ছিল না জেতদার ছিল না
ছিল না সিণ্ডিকেট
অনেক ঝামেলার মধ্য থেকেও প্রতিদিন
ভরত মোদের পেট।
বাঁশ ছিল রাশি রাশি গুহার পাশে কত
কাউকে মোরা বাঁশ দিতাম না
এখনকার মত।
রাজতন্ত্র গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র ছিল কোন রাষ্ট্র
মোরা ছিলাম সবাই রাজা
যেন আমাদেরই রাজত্ব।
বন্যপ্রাণী ঝর বাদলে বিপদ আপদ হলে
একজন এসে অন্য জনের পাশে
দাড়াতাম মোরা সাহস করে
ভগবানের বেশে।
এখন তোমরা বহুদলে কর মারামরি
আমরা কিন্তু সদাই থাকতাম
নিয়ম মেনে সারিসারি।
এখন তোমাদের বিজ্ঞান আছে
আছে প্রযুক্তি
তাই বলে কি পাচ্ছ তোমার সত্যিকার মুক্তি?
বসন ভূষণ সবই আছে
আছে টাকাকড়ি
শুধু চোখের লজ্জ্যা মনের লজ্জ্যা
গিয়েছে তোমাদের ছাড়ি।
এখন তোমরা একের পিছে অন্য জন লাগো
খুনখারাপি গীবত ক্ষতিতে
সদাই ব্যস্ত থাক।
(কবির লেথা চলমান আছে নিয়মিত পড়ার জন্য সাথে থাকুন)
(প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের নিজস্ব, এজন্য কোনরূপ সম্পাদক দায়ী নয়)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here