একটি অসমাপ্ত প্রেমের গল্প

0
204

বিপাশা মন্ডল

“এতোদিন ফোন করেন নি কেন?”
“কেন আপনি জানেন না?”
আমি জানি, আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না, আমি যা করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য। ঢাকা শহরের গুমোট গরমে বারান্দায় দাঁড়িয়েও যেন আমার মুখে একঝলক রূপসা তীরের ঠান্ডা হাওয়া লাগে। খুব বেশি দিন নয়, চার’বছর আগেও আমি যে কোন সময়ে আপনার কাঁধে হাত রেখে মোটর সাইকেলে আপনার পিছনে বসতাম।
“ভালো আছেন?”
“সেই প্রশ্ন করার আপনি কে?”
অভিমানী প্রেমিকের খুবই ক্লিশে প্রশ্ন। সত্যিই আমি কেউ নই। আমি সত্যি সত্যি কেউ হতেও চাইনি। অথচ হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। হয়তো প্রতিদিনের দিনযাপনের স্পর্শের ক্লেদে আমাদের পরিচয়ের পাঁচ বছরের চোখের মুগ্ধতা, মনের ঔৎসুক্য আবিল হয়ে পড়বে বলেই আমি ওটা চাইনি। আমি চেয়েছি আপনি দিনে দিনে স্মার্ট হয়ে উঠুন, ভালো পোষাক পড়ুন, অন্যের মোটর বাইক নয় নিজের বাইকে চড়ুন, আপনার প্রত্যেকটি সময়ের সুন্দর ব্যবহার হোক। আর আপনি চাইতেন আমার অনেক নাম হোক, সুনাম হোক, অনেক সৃষ্টিশীলতায় ডুবে থাকি।
“আপনার অভিযোগ সত্যি, কেউ নই। কিন্তু, কেউ হবার কথা কি ছিল?”
“ছিল না? তাহলে একসঙ্গে ইমিগ্রেশনের ফরম পূরণ করার কথা উঠল কেন?”
“ওটা তো জীবনকে পাল্টানোর এটা প্রাথমিক প্রচেষ্টা, সেই কলেজ, সেই ক্লাস, সেই হৈমন্তী, পাঁচী, বিলাসী, আমি টায়ার্ড হয়ে পড়েছিলাম।”
“আমার তো কোন আপত্তি ছিল না জীবন পাল্টাতে!”
“জানি আমি, সেজন্যই…।”
“সেজন্যই না বলে বিয়ে করে ফেললেন?”
“আমরা কখনো কারোর হাত ছুঁয়েছি, টিচার্স মিটিংয়ে গ্লাস দেওয়া নেওয়া ছাড়া?”
“না।”
“কখনো আমরা একসঙ্গে বাকী জীবন কাটিয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছি? প্রতিজ্ঞা করেছি?”
“না।”
“তাহলে? কিছু একটা ছিল, এমন একটা জায়গায় আমরা দুজনে ছিলাম যেখান থেকে অনেকদূর যাওয়া যেত, আবার ফিরে গেলেও কেউ কাউকে দোষ দেবার কথা নয়।”
“এতোদিনের অনুভবের, অনুভূতির ব্যাপারটা কি শুধুই যুক্তির খেলা?”
আমি এর কোন উত্তর দেই না। এর কোনো উত্তর হয়ও না। কলিগদের, অন্য আত্মীয়স্বজনদের দেখেছি, কি পরিমাণ উল্লেখযোগ্য একেকটা সম্পর্ক শেষপর্যন্ত প্রতিদিনের বাজারের হিসেব, নারী-পুরুষের কে প্রভূত্ব করবে সেই দ্বন্দ্বে এসে শেষ হয়েছে। আমি ওই পথে হাঁটতে চাইনি। বছরের তিনশ পয়ষট্টি-ছেষট্টি দিন একই মানুষের মুখ দেখে একই মানুষের বিছানায় শুয়ে একই ধরনের রাগ বা প্রেম উপভোগ করে কাটানো অনেক কঠিন। আমি আসলে অনুভূতিহীন কাউকেই চেয়েছিলাম। খুব বেশি প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে, মনোযোগ দিয়ে তারপর তা তুলে নিলে ব্যাপারটা আস্তাকুঁড়ের সমান হয়ে দাঁড়ায়। এই যে আমার স্বামী, কোন ধরনের অনুভূতিহীন অনুভবহীন একটা নিরেট কেজো মানুষ, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যন্ত্রের সঙ্গে বসবাস করছি। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি আসলে বেঁচে নেই, মরে গেছি। যখন আমার বাচ্চাদুটো দুপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় বেঁচে আছি। অথবা, ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘শীতকাল কবে আসবে সূপর্ণা’ পড়ে মনে হয়, বেঁচে আছি তো, নইলে তার ভাস্করের শীতকাল প্রার্থনা আমাকে ছুঁয়ে যায় কী করে? মরাকে কে তো কেউ ছোঁয় না। মানুষই মানুষকে পুড়ে বা গোর দিয়ে ফেলে তারপর তো অনুভূতি? “কিছুই যুক্তির খেলা নয়, বাদ দিন ওসব। আপনার বড় ভাই বিয়ে করেছে?”
“হ্যাঁ, আমি করিনি এখনো।”
“ফুল ফুটলে হয়ে যাবে।”
“আপনার কী মনে হয় আমি বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব?”
আমার কী মনে হয়, কী মনে হওয়া উচিত? আমি জানি না, আমি জানি প্রথম যেদিন ওকে দেখি, অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, এতো অল্পবয়সী একটা ছেলে, ও পড়াবে কি করে? পরে দেখা গেল সে আমার সমবয়সী। তত অল্পবয়সী নয়, তারপর… অনেক কথা, মিটিংয়ে যুক্তিহীন পক্ষসমর্থন; কিন্তু একই সঙ্গে পিকনিকে আমার সচেতন অনুপস্থিতি, শিক্ষাসফরে আমার সচেতন অনুপস্থিতি। যে বিষয়টা তখন ঘুমিয়ে ছিল আমি তাকে কখনো অবসরের আবেগের জল হাওয়া দিয়ে বাড়িয়ে তুলতে, পল্লবিত করে তুলতে চাইনি। কেন চাইব? আমি অনেক দেখেছি প্রাত্যহিক দিনযাপনে কীভাবে অনুভূতি অনুভব মরে পঁচে গলে গিয়ে নর্দমায় যাবার পথ খুঁজে ফেরে নিয়ত। আমি সম্পর্কগুলোকে গাছের টবের মতো নিবিড় পরিচর্যায় কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে রেখে দিয়েছি যত করে। কখনো চটকে, দলে-মলে ছিন্ন ভিন্ন করে দিইনি। তাই এই চার’বছর পরেও অভিযোগ ওঠে মৃদুস্বরে, এখানে কি একটু হিপোক্রেসি আছে? থাকতে পারে, কিন্তু আমি বাঁচতে চাই। আমার জীবনে সম্পর্কের উত্তাপ খুব বেশি প্রয়োজন। এই উত্তাপ আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের দেশে প্রতিটি বিবাহিত মানুষের অন্তত যৌনতার অভিজ্ঞতা আছে। সেটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধু মানুষ নয়, প্রত্যেক প্রাণী এমনকী উদ্ভিদও যৌনতার অভিজ্ঞায় নিজেকে সমৃদ্ধ করে প্রাকৃতিক নিয়মে। বংশধর রেখে যায়। কিন্তু মানুষের বন্ধু দরকার, ভরসার জায়গা দরকার। অন্তত আমার। যেন ফেরি থেকে রূপসা পাড়ে নেমে একটা মানুষ পাই যে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, এই শীতের রাত্রে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য। থার্ড গিয়ারের চলন্ত সাইকেলে কেউ একটা কথাও না বলে অনেক কথা বলে নেব আমরা। হয়ত এক ঝলক তাকাবো নেমে গিয়ে। কোন শরীরী সংঘর্ষ নয় কখনো, শুধু মানসিক উত্তাপে আমাদের যে অর্জন, তা সারাজীবন সম্ভাবনার জায়গাটা খোলা রাখবে।
“না আমার কখনো মনে হয়নি, যে আপনি উদগ্রীব।”
“তবে ওকথা বললেন কেন?”
“আরে, আমি তো এমনি বলেছি, আপনিই তো সিরিয়ালে চলে এলেন।”
“তা অবশ্য এলাম।” একটু নিরব থেকে, “মা আপনার কথা কয়েকদিন জিজ্ঞেস করেছিল।”
“কী বললেন, পঁচা মেয়েটা এখন অন্যের ঘরণী?”
“না, সোজা বললাম, ওসব সুন্দরীদের খেয়াল, হঠাৎ একদিন বলল, চলুন আপনার মাকে দেখতে যাব, তাই দেখতে এসেছিল তোমাকে। ভুলে যাও ওসব।”
আমার বুকের মধ্যে তখন মন্দিরের ঘন্টা বাজছে। চমৎকার একটা মন্দির, কয়েকটা ছোট ছোট বাচ্চা প্রার্থনা সঙ্গীত গাইছে, তাদের অনুরোধে আমি দুটো গাইলাম, হা ঈশ্বর… কেন গাইলাম? কেন শুধু শুধু সম্পর্কের আশ্বাস দিয়ে রাখি অবচেতনে? সেই বৃদ্ধা মহিলা যিনি আশাদীপ্ত চোখে বার বার তাকাচ্ছিলেন আমার মুখের দিকে… মনে পড়ে গেল তার গায়ের গন্ধ। আর্শীবাদ নিতে পা ছুঁতে গেলেই যিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পেছনের সবজি খেতের সতেজ ভেজা হাওয়া, খোলা মাঠের উদ্দাম বাতাসের ঢেউ আর বিরাট সরকারী বনায়ন প্রকল্পের ধার ঘেঁষ ছবির মতো ছোট বাড়িটার কথা মনে পড়ে গেল মুহূর্তে। সেদিন সন্ধ্যায় আমি যেন চিরকালের মতো আঁকা হয়ে গিয়েছিলাম ঐ বাড়িতে। ওর মোটর সাইকেলে চড়েই।
“খুব রেগে আছেন মনে হচ্ছে।”
“রাগ করার অধিকার তো পাইনি আমি।”
দমে গেলাম একটু। সেই অধিকার আমি দিতেও চাইনি। অধিকার পেলেই সেটা প্রয়োগে সবসময় বাড়াবাড়ি হয়। সরকার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, সংসার, বন্ধুত্ব, প্রেম, সব জায়গায়, এই জিনিসটা দেওয়ার ব্যাপারে সব সময় সতর্ক আমি। এতো সতর্ক থেকেও কি নিজেকে বাঁচাতে পেরেছি? অনেক সময় না দিলেও ‘অধিকার দিয়েছি’ এই তকমা ভূতগ্রস্থের মতো অনেকের ঘাড়েই ভর করে, তা আর নামানো যায় না। এই যে আমার সংসারে আমার যন্ত্রমানব কতটুকু খেয়াল করে- আমি কি দিয়েছি আর দিইনি? কি পেয়েছি আর পাইনি? কি হওয়া উচিত আর উচিত নয়? তারপরেও গাছের নিয়মে সম্পর্কের পাতা বেড়ে চলে, সংসার বেড়ে চলে, বয়স বেড়ে চলে, হাড়ি-কড়াই থালাবাটি বেড়ে চলে। এটা বাংলাদেশ, এখানে নারীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এখনো। এখানে চাইলেই কেউ সব কিছু ছেড়েছুড়ে নতুন করে শুরু করতে পারে না। আর নতুন করে শুরু করলেই কি নতুন অভিজ্ঞতা হয় কারুর? হয় তো সেই পুরনো অভিজ্ঞতারই পুনরাবর্তন। পুরনো দিনেরই নতুন যাপন।
“বাদ দেন ওসব, চাকরী কেমন চলছে, আমাদের পুরনোরা সবাই আছে?”
“না, আসলাম সাহেব, নীতা ম্যাডাম, রাকিব সাহেব আর সন্তোষকুমার ছাড়া সবাই নতুন। আমিও আছি। আমার এমনই হয়। চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে পাল্টে ফেলি না।”
কথাটার মধ্যে খোঁচা আছে, সেই সঙ্গে আশ্বাসও। এখনও তার মন পোড়ে আমার জন্য। চার বছর পরেও! খুবই বিস্ময়কর!
“এখনো কি আমার জন্য দাঁড়াবেন, রূপসা পাড়ে?” এক মুহূর্তের নীরবতার পর ওপার থেকে বললো,
“আমি প্রতিদিন যাই এখন নিজের মোটর সাইকেল। একা একা। আবার ফিরেও আসি। একা একা। থার্ড গিয়ারে স্পীড। তবু মনে হয় কেউ যেন নামল ফেরি থেকে, সোনারঙ শাড়ি পড়া। যেন আমার পিছনে কোন হলুদ সুগন্ধ কাঁধ ছুঁয়ে বসে আছে।”
শেষের দিকে গলাটা কি একটু ধরে আসে। আসে। আমারও আসে। কেন আসে? আসলে আমার আর কখনো রূপসা পাড়ে বাড়ি ফিরবার জন্য কারুর সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। রূপসায় এখন বিশাল কংক্রীটের সেতু। বিকেলের আগেই পৌঁছে যাব বাড়ি। ফেরির দুর্ভোগ শেষ হয়ে গেছে। সেতু আমার জীবনেও, কংক্রীটের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here