ঈদের আনন্দ কতিপয় বিশেষ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ

0
190
মোঃ মাসুম খান
কর্মব্যস্ত একঘেয়েমি জীবনের ক্লান্তি দূর করতে মাঝে মাঝে বিনোদন ও উৎসবের প্রয়োজন। প্রিয়জন ও আত্মীয় স্বজনদের মধুময় সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্য সম্পর্কগুলো আরও সজীব ও প্রাণবন্ত করার জন্য প্রয়োজন কোনো সম্মিলন বা মিলন মেলার। কর্মব্যস্ত মানুষ যেন তাদের প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনের সংকীর্ণ বলয় থেকে বের হয়ে প্রকৃতির নির্মল পরিবেশে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাময় সজীব সতেজ বাতাসে শ্বাস নিতে পারেন এজন্য শ্রান্তি ও বিনোদন প্রয়োজন যা কর্মক্লান্ত প্রাণে আনতে পারে নবশক্তি ও কর্মপ্রেরণা।
পৃথিবীর সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের প্রচলন আছে। উৎসব জাতিগত ঐক্যের চেতনাও সৃষ্টি করে। উৎসবের দিনগুলোও যে কোনও জাতির স্বাতন্ত্র্য ও পৃথক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও প্রতীকস্বরূপ। একটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয় উপস্থাপন ও বিনির্মাণে তাদের মধ্যে ঐক্যের চেতনা ও ভ্রাতৃত্বের মৈত্রী জাগ্রত করতে সম্মিলিত আনন্দ ও উদযাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঈদের আনন্দ কতিপর বিশেষ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। খেটে খাওয়া অভাবী মানুষের কাছে ঈদ কোন খুশির বারতা নিয়ে আসেনা তাদের কাছে ঈদ প্রতিয়মান হয় “পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি” হিসেবে।
নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম ক্রমাগত বেড়েই চলছে। গরীব, দুস্থ, অভাবী মানুষেরা তাদের সন্তানদের পেটের আহার যোগাতে পারেনা সেখানে তাদের জন্য নতুন পোষাক উপহার দেয়া কল্পনাতীত! অথচ বেশিরভাগ বিত্তবান ধনীর দুলালেরা আতশবাজি, মদজুয়া, হৈ হুল্লোর আর বেহায়াপানায় ঈদের পবিত্রতা ম্লান করে দেয়।
যে সকল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে যুদ্ধ চলছে। সেখানে তাদের জীবন প্রদীপ নিষ্প্রভ তাদের জীবনে ঈদ কোন আনন্দের বারতা নয়। অন্যদিকে সিয়াম সাধনার ফসল খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়না বেশিরভাগ মানুষের জন্য। কিছুদিন ইসলামিক চেতনায় জীবন যাপন করলেও ধীরে ধীরে তা ম্লান হয়ে যায়। মানুষ আবার পাপের জীবনে জড়িয়ে পরে।
রাসুল (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গেলেন তখন সেখানে জাহেলি যুগ থেকে প্রচলিত দু’টি উৎসবের দিন ছিল
১. শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’
২. বসন্তের পূর্ণিমায় ‘ মেহেরজান’।
রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এই দুটি দিবস কীসের? মদিনাবাসী সাহাবিরা বললেন, জাহেলি যুগ থেকে আমরা এই দুটি দিবসে খেলাধুলা ও আনন্দ ফূর্তি করে থাকি।
রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহ এই দুই দিনের বদলে তোমাদের নতুন দু’টি উৎসবের দিন দিয়েছেন: ঈদ – উল- ফিতর ও ঈদ- উল- আযহা (মুসনাদে আহমদ ১৩০৫৮)। এভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আলাদা আমেজ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে দুটি নতুন উৎসবের সূচনা হলো।
‘ঈদ’ শব্দটি আরবি শব্দ ‘আওদ’ থেকে উৎকলিত। ‘আওদ’ অর্থ ঘুরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। ঈদ মানে প্রতি বছর ঘুরে ফিরে আসে এ রকম একটি দিন। আরবিতে বিশেষ দিবস বা উৎসবের দিনকে ঈদ বলে। ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা বা ইফতার করা। আমাদের কাছে পরিচিত ‘রোজার ঈদ’কে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় ঈদ – উল- ফিতর বা রোজা ভাঙার উৎসব।
পুরো রমজানে প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর মুসলমানরা উপবাস ভাঙে। এটা শুধু সেদিনের রোজা বা উপবাসের ইফতার। ঈদের দিন এক মাসের নিয়মিত উপবাস ভাঙা হয়। সেটাও এক রকম ইফতার। রোজাদারের জন্য প্রত্যেক দিনের ইফতারের মুহূর্তই আনন্দের, ঈদুল ফিতরের দিন বিশেষভাবে আনন্দের ও উৎসবের। রাসুল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দক্ষণ রয়েছে তার একটি হলো ইফতারের সময় অন্যটি হলো পরম করুনাময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার সঙ্গে দেখা করার সময় ( বুখারি ৭৪৯)।
ঈদ- উল -ফিতরের দিন রোজাদার মুসলমানদের জন্য পুরস্কারের দিন। হজরত আউস আল আনসারী (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ফেরেশতারা রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান এবং মুসলমানদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, হে মুসলমানগণ! তোমরা দয়ালু প্রতিপালকের দিকে এগিয়ে এসো। উত্তম প্রতিদান ও বিশাল সাওয়াব-প্রাপ্তির জন্য এগিয়ে এসো। তোমাদের রাত্রিবেলার নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তোমরা সে নির্দেশ মেনে নামাজ পড়েছো। তোমাদের দিনে রোজা রাখতে বলা হয়েছিল, তোমরা সে নির্দেশও পালন করেছো, এক মাস রোজা রেখেছো। গরিব দুঃখীদের আহার করানোর মাধ্যমে নিজের প্রতিপালককে তোমরা আহার করিয়েছো। এখন নামাজ পড়ে এসব পুণ্যকর্মের প্রতিদান ও পুরস্কার গ্রহণ করো। ঈদের নামাজ পড়ার পর একজন ফিরিশতা ঘোষণা দেন, শোন নামাজ আদায়কারীরা! তোমাদের মহান রাব্বুল আলামিন মাফ করে দিয়েছেন, সকল গুনাহ থেকে মুক্ত অবস্থায় নিজ নিজ আবাসে ফিরে যাও। আজ পুরস্কার প্রদানের দিন। আকাশে এই দিনের নামকরণ করা হয়েছে ‘পুরস্কারের দিন’। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ঈদের দিন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলেন, তারা আমার ফরজ আদায় করে প্রার্থনার জন্য বের হয়েছে। আমার মর্যাদা বড়ত্ব ও সম্মানের কসম! আমি অবশ্যই তাদের প্রার্থনা কবুল করবো। তারপর আল্লাহ বান্দাদের উদ্দেশ করে বলেন, ফিরে যাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তোমাদের পাপগুলোকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছি। এরপর সবাই মহান রাব্বুল আলামিনের ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে পরমসুখের জান্নাতী জীবনের অধিকার লাভ করে।
ঈদ- উল- ফিতরের একটি ওয়াজিব বা আবশ্যিক আমল হলো সালাতুল ঈদ বা ঈদের নামাজ। ঈদের উৎসব শুরু হয় এই সালাতের মাধ্যমে। ঈদের দিন প্রথম প্রহরে ধনী-দরিদ্র আমির-ফকির নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে দাঁড়ায়। একসঙ্গে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। পরস্পরের খোঁজ-খবর নেয় ও কুশল বিনিময় করে। ইসলামে মুসলমানদের এই সম্মিলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) নারী পুরুষ নির্বিশেষ সবাইকে ঈদগাহের জমায়েতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি কোনও নারী যদি ঋতুমতী হওয়ার কারণে নামাজ পড়তে না পারেন, তাকেও ঈদগাহে উপস্থিত হতে বলেছেন। উম্মে আতিয়্যা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবালিকা, পর্দানশীন ও ঋতুমতী নারীদের ঈদের সালাতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ঋতুমতী নারীরা সালাতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে তবে পুণ্যের কাজ (দান-সাদকা) ও মুসলমানদের দোয়ায় অংশগ্রহণ করবে। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসুল্লাহ! আমাদের অনেকের ওড়না থাকে না। রাসুল (সা.) বললেন, তার কোনও বোন তাকে ওড়না দিয়ে সাহায্য করবে। (সহিহ বুখারি ১৯২৯)। ঈদের আরেকটি আবশ্যিক আমল হলো সদকাতুল ফিতর। ক্ষমাপ্রাপ্তির খুশিতে এবং রমজানে কৃত আমলের ত্রুটি দূর করতে মুসলমানরা সদকাতুল ফিতর আদায় করে। সামর্থ্যবান ও সচ্ছল মুসলমানদের ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদ উদযাপন সার্বজনীন করে তুলতে, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই সদকাতুল ফিতরের বিধান এসেছে। পাশাপাশি এই সদকার মাধ্যমে রোজায় হয়ে যাওয়া ভুল- ত্রুটি মাফ হয়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম রোজাকে বেহুদা ও অশ্লীল কথা-আচরণ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য সাদাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন।
পবিত্র রমজানের একমাস আমাদের সবাইকে যে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দিয়ে চলে গেলো তা এক নজরে দেখে নেই।
রমজানের মূল শিক্ষা সমুহঃ
১) হারাম খাবার গ্রহণ ও হারাম উপার্জন হতে সারা বছর বিরত থাকা।
২) একনিষ্ঠ ভাবে নিয়মিত জামায়াতের সাথে পাচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।
৩) বেহুদা গল্প, গুজব, বাজে গল্প শোনা ও বলা হতে সারা বছর বিরত থাকা।
৪) সকল প্রকারের অশ্লীল ছবি, নাটক, গান দেখা ও শোনা হতে সারা বছর বিরত থাকা।
৫) সকল ধরনের খারাপ কাজ হতে সারা বছর বিরত থাকা।
৬) সারা বছর ভালো কাজ করা ও ভালো কাজ সমাজে প্রচলনের জন্য চেষ্টা করা।
৭) খারাপ ব্যক্তি ও সংগঠন হতে নিজেকে মুক্ত করে
কেবল আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজেকে ব্যস্ত রাখা।
৮) সারা বছর আল্লাহর ভয়ে মনে লালন করে নিজেকে গড়ে তোলা।
৯) সকল ধরনের হারাম সম্পর্ক হতে নিজেকে পবিত্র রাখার শিক্ষা দিয়েছে রমজান।
১০) সর্বপরি, আল্লাহতালা আমাদের সবার সকল কর্মকাণ্ড দেখছেন এই অনুভূতি লালন করে সকল কাজ করার শিক্ষা দিয়েছে রমজান।
১১) সারা বছর নিয়মিত কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখি। অর্থাৎ নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন করি।
১২) ইসলাম, আলেম ওলামাদের সাথেই সারা বছর মধুর সম্পর্ক রাখবো।
আমরা পবিত্র রমজানের উপরুল্লিখিত শিক্ষা আমাদের জীবনে ধারণ করে আগামী রমজান পর্যন্ত যদি কাটাতে পারি তবেই কষ্টের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে বলে আশাকরি।
যা হোক , সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর এই অবসর যাপন ও বিনোদন এক অনাবিল প্রশান্তি ও আনন্দ বয়ে আনে আমাদের জীবনে। আত্মিয়তা, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব ও সেীহার্দের বিভায় আলোকিত হয়। আমাদের অবসাদ -ক্লিষ্ট জীবনের মরা গাঙে আসে প্রাণশক্তির জোয়ার। নতুন উদ্যম ও কর্মপ্রেরণা নিয়ে আমরা আবার কর্মজীবনে আত্মনিয়োগ করতে পারি আপন মহিমায়।
লেখক: কবি ও সাহিত্যিক, সদস্য সচিব, পিরোজপুর সাহিত্য পরিষদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here