শ্রদ্ধেয় মাষ্টার মশাই

0
822
সেকাল
হাছিবুর রহমান
শীতের সকাল তার পরেও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কুল গাছের নিচে ভোঁ দৌর, কে কার আগে যেতে পারে । কারন যে আগে যাবে সেই গাছ থেকে পরা বড়ইগুলো টোকাতে পারবে। ইতিমধ্যে খেজুর গাছে রসের ঠিলা নামাতে ব্যস্ত হয়ে পরেছে হিয়ালিরা। পাখিরা রস খাওয়ার জন্য গাছের চারি দিকে গুরপাক খাচ্ছে আর কিচির মিচির শব্দ করছে। আমি তখন পাঠশালায় পড়ি, মাস্টার মশাই ইতিমধ্যে স্কুলে এসেগেছে। আমার মা চিৎকার শুরু করে দিয়েছে , লেখা পড়া নাই খালি বাদরামি, তারাতারি স্কুলে যা । হোগলা পাতার পাটি, তালপাতা, কয়লা দিয়ে তৈরি করা কালির দোয়াত, বাঁশের চিকন টুনি দিয়ে তৈরি কলম এবং একটা আদর্শলিপি বই এই ছিল আমার লেখা পড়ার সরনঞ্জাম, মাজেদুল কাক্কুগো কাচারী ঘরটি ছিল আমাদের পাঠশালা। আমার মা সব কিছু গুছিয়ে আমার বোগলে চেপে পাঠশালায় পাঠিয়ে দিল, ইতিমধ্যে সেখানে পড়া লেখা শুরু হয়ে গেছে। কাচারী ঘরঠি ছোট ছিল, ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা তার চেয় দেরগুন, তাই আমাকে বিছানা পেতে বাহিরে বসতে হল। তখন পাঠশালায় ডুকার সময় দাত দেখাতে হত, নখ দেখাতে হত, চুল ছোট না বড় সেটা দেখতো, তবে জামা কাপড়ের কোন বাচ বিচার ছিলনা, মজার ব্যাপার হল কয়লার কালি দিয়ে লিখতে লিখেতে আমরা ও অনেকে কয়লার মত সুন্দর হয়ে যেতাম। কালি মুখে, গালে, কপালে, জামা কাপড়ের তো অরিজিনাল কালার বোজার কোন উপায় থাকতো না। মাস্টার মসাই খুব গরীব ছিল তার পরেও আমাদের বেতন ছিল যতসামান্য মাসে ১৫ টাকা। সেই ১৫ টাকাও কখনো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিত বা চাইতো না , অভিভাবকরা এসে মাস্টার মশাইয়ের হাতে দিত। তখন তো আর বুঝতামনা এখন বুঝি, তাই মাস্টার মশাই যদি এখন জীবীত থাকতো তাহলে একবার হলেও এই প্রশ্নটি করতাম যে এত কম মাইনে কেন নিতেন, হয়তোবা তিনি বলতেন আমি মাইনির জন্য পড়াই না শিক্ষা দানের জন্য পড়াই, শিক্ষা দানে কোন বিনিময় হয়না ইত্যাদি। সেখানে পড়ানো হত “ সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি” ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর বাক্য বচন। মাস্টার মশাইকে আমরা যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা করতাম, শুধু আমরা নয় আমাদের পিতা মাতারাও তাকে দেখলে বসা থাকলে উঠে দাড়াত। আমাদের পাঠশালার কাছেই ছিল বিড়ি ফ্যক্টরী, তাই অনেকেই বিড়ি পান করতো, কিন্তু কোন মুরব্বী অর্থাৎ মাস্টার মশাইর বাবার বয়সী লোক ও যদি তার সামনে পরতো, সাথে সাথে বিড়িটি ফেলে দিত অথবা গুঝে ফেলতো। আমিও সেই সব মানুষের আচরন দেখে দেখে আদব কায়দা, চাল, চরণ শিখেছি। এর পরে প্রাইমরীতে ভর্তি হলাম সেখানেও স্যারেরা ছিল শিক্ষা দানে খুব উৎসাহী, প্রানবন্ত এবং নিবেদিত। যদিও তখন স্যারদের হাতে সর্বদা ব্যাতের লাঠি থাকতো, ভয়ে ভয়ে থাকতাম কখন কার পিঠে বারি পরে। এতটুই থাক এ পর্যন্ত পড়তে ও এখন অনেকের কষ্ট লাগবে কারন আমি নিজে থেকেই বুঝি, এই আমি এক সময় আমার বালিশ ছিল বই, এখন মোবাইলের ফলে সেঠি আর নেই, মাঝে মাঝে পড়ার চেষ্টা করি কিন্তু ১-২ পৃষ্টা পড়ার পরে মাথা ঘুরায়। বর্তমান সময়ের কথা আপনারাই বুঝে নেন, শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে চলছে সেটা আপনিও যা দেখছেন, আমিও তাই, হয়তোবা কারো কাছে ভালো আবার কারো কাছে খারাপ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here