আয়না

0
353

শিক মাহমুদ রিয়াদ

১.

আসিফ উদাসীন হয়ে ব্যালকনিতে বসে আছে। তার মন খারাপ। মাথায় রাজ্যের চিন্তা।

 রান্নাঘরে বিথি রুটি বানাচ্ছে। আগে তার রুটির শেপ হতো একেক দেশে মানচিত্রের মতো। তবে লকডাউনে ইউটিউব দেখে সে আজকাল রুটির ভালো শেপ দিতে পারে। একেবারে গোল হয়। তার চুল উড়ছে,কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

 ওদের বিয়ে হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। আসিফ যখন বিথিকে দেখতে গিয়েছে সেদিনই বিথিকে ওর ভালো লেগে যায়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে আঙটি বদলের আগের দিন। বিথির বাবা হঠাৎ করেই এ বিয়েতে নিজের মত উঠিয়ে নেন। তার এক কথা, বেসরকারী চাকুরীজীবির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেবেন না। কোন ভরসায় দেবেন? বেসরকারি চাকরীর নিশ্চয়তা আছে? এর থেকে সরকারী চাকুরীওয়ালার সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন।  সৎ পাত্রে কন্যা দান করবেন। 

আসিফের মন খারাপ হয়ে গেলো৷ এই মেয়েকে সে দারুণ পছন্দ করে ফেলেছে।এই মেয়ের চঞ্চলতা তার মনে ধরেছে। বিথিও আসিফকে পছন্দ করে ফেলেছে।আসিফ সহজ-সরল ছেলে। দুজনের মধ্যে কত কথা হয়েছে এই ক’দিনে। যেন ওরা কতদিনের চেনা।

বিথির বাবা তার জায়গা থেকে এক পাও নড়লেন না। বিথি কান্নাকাটি জুড়ে দিলো। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলো। 

বিথির মা বিথির বাবাকে বোঝালেন,ছেলে শিক্ষক।সম্মানের পেশা। তাছাড়া যে বেতন পায় তা দিয়ে ওরা দুজন দিব্যি সুখে থাকতে পারবে। 

অনেক বোঝানোর পরে বিথির বাবা এ বিয়েতে সায় দিলেন। 

আসিফ কল্পনা থেকে ফিরে এলো বিথির ডাকে৷ বিথির কোমড়ে হাত। আরেক হাতে রুটি বেলার বেলন। “কি এত উদাসীন কথা ভাবছো?’ কার কথা ভাবছো? তোমার আগের প্রেমিকার কথা? 

আসিফ মুচকি হেঁসে বলল,’আমার কোন প্রেমিকা নেই। ‘

বিথি আসিফের হাত ধরে বলল,’ঠাট্টা করছিলাম বন্ধু! এসো খেতে এসো। ‘

২.

আসিফ খাবার টেবিলেও অমনোযোগী। বিথির চোখ এড়ালো না। বিথি চামচ দিয়ে টক টক আওয়াজ করার পরে আসিফের উদাসীন ভাব কাটলো। 

বিথি নরম গলায় বলল,’কি হয়েছে? ‘ 

আসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।গ্লাস থেকে একচুমুক পানি খেয়ে বলল,’আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই বিথি। ‘ 

বিথি রুটি ছেড়া রেখে আসিফের দিকে তাকিয়ে বলল,’বলো’ 

আসিফ শান্ত গলায় বলল,’আমাদের এই বাসাটি ছেড়ে দিতে হবে। ‘

বিথি যেন হতবাক হয়ে গেলো,সে বলল,’বাড়িওয়ালা কিছু বলেছেন?’ 

আসিফ বলল,’বিথি! তুমি তো জানো এই করোনার ছুটিতে আমার স্কুল বন্ধ। স্কুল থেকে বেতনও পাচ্ছি না ঠিকঠাক। শুনেছি এই স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে।তাছাড়া টিউশানীও করাতে পারছি না। আমার জমানো টাকা গুলো শেষ হয়ে এসেছে প্রায়’

আসিফ থামলো। এবার পুরো এক গ্লাস পানি এক চুমুকে শেষ করলো। বিথি চুপ করে রইলো। 

আসিফ মাথা নিচু করে বলল,’আইয়্যাম সরি বিথি! ‘

বিথি কোন কথা বললো না,চুপ করে রইলো। 

বিথির চোখের কোনে জল। তবুও তাকে কোন কারনে খুশি দেখাচ্ছে। রাস্তায় পিক-আপ দাঁড়িয়ে আছে। এই পিকাপে মাল-জিনিস ওঠানো হচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলটা ওঠানো হচ্ছে। এই ড্রেসিং টেবিল বিথির বাবা বিথির নতুন সংসারের জন্য দিয়েছে। 

বিথি বলছে, ‘খুব সাবধানে ওঠান! খুব সাবধানে। ‘

ওরা দুজন বসে আছে পিক-আপের পেছনে। বিথির চুল উড়ছে বিথির চোখের কোনে জল। আসিফ বিথিকে দেখছে। 

 ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় অসুস্থ শহর দেখছে নিজেকে। 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here